স্বপ্ন ও সংগ্রাম · নিজ জীবন
YouTube দেখে বংশীবাদক হয়ে উঠার গল্প!
একটি বাঁশি, কিছু স্বপ্ন আর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্প!!
২০২০ সালের শেষের দিকের কথা। পুরো পৃথিবী তখন করোনা মহামারির কবলে। চারদিকে অদ্ভুত এক নীরবতা, অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক। পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়টাতে আমিও মানসিকভাবে বেশ খারাপ সময় পার করছিলাম। এর মধ্যেই হারাই আমার জীবনের অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষকে!! আমার নানা, যাঁর কাছে ছোট থেকে বড় হয়েছি, যে আমার জীবনে Inspiration, এককালে তিনিও বাঁশি বাজিয়েছেন তবে তাঁর কাছে কখনও শেখার সৌভাগ্য হয়ে উঠেনি, আমার জন্মের অনেক আগেই তিনি বাজানো বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন! করোনাকালে তাঁকে হারানোর শূন্যতা আমাকে ভেতর থেকে অনেকটা ভেঙে দিয়েছিল।
ঠিক সেই কঠিন সময়েই, ২০২০ সালের অক্টোবরের দিকে, একটা সিদ্ধান্ত নিই। ঠিক করি, আমি বাঁশি বাজানো শিখব!!
ছোটবেলা থেকেই বাঁশির প্রতি আমার আলাদা একটা ভালো লাগা ছিল। সব সময়ই মনে হতো, জীবনে এমন কিছু করতে চাই, যা আমাকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচয় দেবে। তখন আমার অনেক বন্ধু গিটার শিখছিল, কেউ কিবোর্ড, কেউবা অন্য কোনো Modern Instrument!! কিন্তু আমার মন পড়ে ছিল Traditional Instrument বাঁশের বাঁশিতে।
আমার মনে হতো, বাঁশির সুরের মধ্যে অদ্ভুত একটা মায়া আছে। খুব সাধারণ একটা বাঁশি থেকেও এমন কিছু সুর বেরিয়ে আসতে পারে, যা মানুষের মনের গভীরে পৌঁছে যায়। সেই মায়াটাই আমাকে টানত।
আমার বাঁশি শেখার শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। প্রথম বাঁশিটা কেনার স্মৃতি এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে। মাত্র ৭০ টাকার একটা বাঁশি কিনেছিলাম। বাসা থেকে প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরের একটা দোকানে হেঁটে গিয়েছিলাম। কেবল ক্লাস ৮ এ পড়ি তখন! নিজের টিফিনের জমানো টাকা দিয়েই কিনেছিলাম আমার প্রথম বাঁশি। তখন হয়তো জানতাম না, এই ছোট্ট বাঁশিটাই একদিন আমার জীবনের একটা বড় অংশ হয়ে উঠবে।
তখন আমার নিজের কোনো ফোনও ছিল না। বাবা কিংবা মায়ের ফোন নিয়ে ইউটিউবে বাঁশি বাজানোর টিউটোরিয়াল খুঁজতাম। সা-রে-গা-মা শেখা, বাঁশিতে সঠিকভাবে ফুঁ দেওয়া, স্বর তোলার চেষ্টা সবকিছুই চলত ইউটিউব দেখে দেখে। ভিডিও থামিয়ে থামিয়ে অনুশীলন করতাম, আবার চেষ্টা করতাম। কখনো সুর মিলত, কখনো মিলত না। কিন্তু শেখার আগ্রহটা ছিল প্রবল। আস্তে আস্তে তীব্র ভাল লাগা কাজ করল।
কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শেখার সুযোগ বা শুরুতেই কোনো গুরুর হাত ধরে শেখা এমন কিছু ছিল না আমার। ছিল একটা বাঁশি, অন্যের ফোনে ইউটিউব দেখার সুযোগ আর নিজের ভেতরের তীব্র ইচ্ছা আর ভাল লাগা!
তবে পথটা মোটেও সহজ ছিল না।
আমি যখন বাঁশি বাজানো শুরু করি, আশপাশের অনেক মানুষের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। কেউ পাগল বলত, কেউ বলত, এসব করে কী হবে, কেউ বলত শব্দ দূষণ করিস না! পরিবার থেকেও সাপোর্ট ছিল একদমই শূণ্য, বাবা কয়েকটি বাঁশি ভেঙ্গেও ফেলেছিলো! কিন্তু আমি জানতাম, আমি কেন বাঁশি শিখছি। তাই সবকিছুর উর্ধ্বে নিজের ইচ্ছাটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলাম।
আমার জীবনের একটা মজার ঘটনা আছে, যেটা আমাকে প্রথমবার স্টেজে ওঠার সাহস দিয়েছিল।
আমাদের বাড়ির সামনেই বিশাল একটা মেলা হয়। একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরেছিলাম। সে বলেছিল, আমি যদি মেলার স্টেজে উঠে বাঁশি বাজাতে পারি, তাহলে সে আমাকে মেলা থেকে কিছু খাওয়াবে! কথাটা শুনে হয়তো অন্য কেউ হাসিঠাট্টা করে এড়িয়ে যেত। কিন্তু আমি সত্যিই বাঁশি হাতে স্টেজে উঠে পড়লাম। সেখানে একটি গান বাজালাম।
সেই প্রথম মঞ্চে ওঠা। হয়তো সেটা বিশাল কোনো অনুষ্ঠান ছিল না, হয়তো দর্শকদের কাছে সেটা খুব সাধারণ একটা পারফরম্যান্স ছিল। কিন্তু আমার কাছে সেই মুহূর্তটা ছিল অসাধারণ। কারণ, সেদিন আমি শুধু একটা গান বাজাইনি, নিজের ভেতরের একটা ভয়কেও জয় করেছিলাম।
সেখান থেকেই স্টেজে বাঁশি বাজানোর প্রতি আমার আগ্রহ বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে নিজের বাজানোকে আরও ভালো করার চেষ্টা করেছি। পরবর্তী সময়ে গুরু ধরে ক্লাসিক্যাল মিউজিক শিখেছি, বাঁশির অ্যাডভান্স বিষয়গুলো আয়ত্ত করার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন মিউজিশিয়ানের কাছ থেকেও অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে। ইউটিউব দিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আমাকে ধীরে ধীরে আরও গভীরভাবে সংগীত শেখার পথে নিয়ে গেছে।
এরপর জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত এসেছে, যেগুলোর কথা ভাবলে আজও ভালো লাগে।
আমাকে নিয়ে ২০২৩ সালে সময় টিভিতে আলাদা কয়েকটি ফিচার প্রচারিত হয়েছে, শুধুমাত্র আমার বাঁশি বাজানোর যাত্রাকে কেন্দ্র করে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আবারো সময় টিভি সহ, LEAD ACADEMY, Daily KARATOA এর মতো প্ল্যাটফর্ম গুলোও আমার যাত্রাকে তুলে ধরে। যে ছেলেটা একসময় অন্যের ফোনে ইউটিউব দেখে বাঁশি বাজানো শিখত, তার গল্প একদিন দেশের ন্যাশনাল টিভিতে উঠে আসবে, শুরুতে এটা কল্পনাও করিনি।
আবার জাতীয় প্রতিযোগিতা সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় কৃতিত্বের সাথে Champion হই, ভাল স্থান অর্জন করি! পুরুষ্কারসহ নানান সম্মাননা স্মারক জিতি!
আমার সংগীতযাত্রার আরেকটি বিশেষ প্রাপ্তি হলো, বাংলাদেশের জনপ্রিয় ট্রাভেল ভ্লগার Salahuddin Sumon-এর ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকেও আমার বাঁশির সুরের ছোঁয়া রয়েছে। ভ্রমণের দৃশ্য, প্রকৃতির সৌন্দর্য আর পথচলার গল্পের সঙ্গে নিজের বাজানো বাঁশির সুর মিশে যেতে দেখা আমার কাছে সত্যিই অন্যরকম এক অনুভূতি!! এছাড়াও বিভিন্ন জায়গা কবিতা, নাটক সহ সৃজনশীল সৃষ্টিতে আমার বাজানো সুর জায়গা করে নিয়েছে।
আরেকটি অন্যরকম বড্ড ভাল লাগার বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ডগুলোর সঙ্গে একই মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ পাওয়া। নগর বাউল জেমস, Miles, শিরোনামহীন, সোনার বাংলা সার্কাস, Highway ও লালন ব্যান্ডের মতো শিল্পী ও ব্যান্ডের সঙ্গে একই স্টেজ শেয়ার করে Solo Performance করা আমার কাছে ভীষণ আনন্দের এবং গর্বের বিষয়।
ছোটবেলা থেকে যাঁদের গান শুনে বড় হয়েছি, একসময় তাঁদের সঙ্গে একই স্টেজ শেয়ার করতে পারা এই অনুভূতি আসলে ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন। আমার কাছে এগুলো শুধু অর্জন নয়, বরং আমার দীর্ঘদিনের চেষ্টা আর ভালোবাসার কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত।
তবে আমার কাছে বাঁশির সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু টেলিভিশনে ফিচার হওয়া কিংবা বড় বড় শিল্পীদের সঙ্গে একই মঞ্চে পারফর্ম করা নয়। আমার কাছে এর চেয়েও বড় কিছু আছে।
আমার বাঁশি যদি কারও মন ভালো করে দেয়, কারও ক্লান্ত দিনের শেষে একটু প্রশান্তি এনে দেয়, কিংবা কারও মনে জমে থাকা অস্থিরতার মধ্যে কয়েক মুহূর্তের শান্তি তৈরি করে, তাহলেই আমার মনে হয়, আমার সংগীতচর্চা সার্থক।
বাঁশি আমাকে শুধু একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে পরিচয় দেয়নি, আমাকে দিয়েছে নিজের একটা স্বতন্ত্র পরিচয়। জীবনের একটা কঠিন সময়ে বাঁশি আমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। যে সময়ে চারপাশের সবকিছু অনিশ্চিত মনে হতো, সেই সময়েই বাঁশি আমাকে একটা নতুন পথ দেখিয়েছিল।
আজও সেই পথেই এগিয়ে চলেছি। এখনো অনেক কিছু শেখার আছে, অনেক দূর যাওয়ার আছে। ভবিষ্যতে বাঁশি নিয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই। আমাদের সংস্কৃতির এই ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। নতুন প্রজন্মের কাছে বাঁশির সৌন্দর্য তুলে ধরতে চাই, যাতে এই সুর, এই ঐতিহ্য হারিয়ে না যায়।
পেছনে ফিরে তাকালে আমার সেই ৭০ টাকার বাঁশিটার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে বাসা থেকে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার হেঁটে দোকানে যাওয়ার কথা, অন্যের ফোনে ইউটিউব দেখে সুর তোলার চেষ্টা, মানুষের সমালোচনা আর প্রথমবার মঞ্চে ওঠার সেই সাহসের কথা।
আজ বুঝি, বড় কিছু শুরু করার জন্য সব সময় বড় কোনো সুযোগের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো প্রয়োজন হয় ছোট্ট একটা সিদ্ধান্ত, সামান্য কিছু উপকরণ আর নিজের স্বপ্নের প্রতি গভীর ভালোবাসা।
আমার গল্পটা তাই শুধু ইউটিউব দেখে বাঁশি শেখার গল্প নয়। এটা নিজের ভেতরের ভালো লাগাকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। মানুষের সমালোচনার মধ্যেও নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার গল্প। আর জীবনের একটা কঠিন সময় থেকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখার গল্প।
একটা ছোট্ট বাঁশি দিয়ে শুরু হয়েছিল আমার যাত্রা। আজও সেই বাঁশিই আমার আরেক পরিচয়, আমার প্রশান্তি, আমার স্বপ্ন। আর আমি চাই, এই বাঁশির সুরের সঙ্গে আমার পথচলা আরও অনেক দূর এগিয়ে যাক।
কথা থাক। চা ঠান্ডা হোক।
